বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১১ আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
৯ মহর্‌রম, ১৪৪৮ হিজরি

পূবাইলে জমে উঠেছে ঐতিহ্যবাহী নৌকা শিল্প, ব্যস্ত সময় পার করছেন কারিগররা

পূবাইল (গাজীপুর) প্রতিনিধি : বর্ষা মৌসুমকে সামনে রেখে গাজীপুর মহানগরীর পূবাইলে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে পেয়েছে ঐতিহ্যবাহী কাঠের নৌকা শিল্প। খাল-বিল, জলাভূমি ও নিম্নাঞ্চলে যাতায়াতের প্রয়োজনীয়তা বাড়তে থাকায় বিভিন্ন আকারের নৌকা তৈরি ও মেরামতের কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন স্থানীয় কারিগররা।

সম্প্রতি পূবাইল বাজারসংলগ্ন একটি নৌকা নির্মাণ কারখানা ঘুরে দেখা যায়, সারিবদ্ধভাবে তৈরি হচ্ছে নতুন কাঠের নৌকা। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কারিগররা কাঠ কাটা, বাঁকানো, জোড়া লাগানো এবং নৌকার বিভিন্ন অংশ নির্মাণে ব্যস্ত রয়েছেন। কারখানাজুড়ে সাজানো বিভিন্ন আকারের নৌকা গ্রামীণ ঐতিহ্য ও কারিগরি দক্ষতার এক অনন্য চিত্র তুলে ধরছে।

নৌকা নির্মাতা গোলাম হোসেন জানান, বর্ষা মৌসুমই তাদের ব্যবসার প্রধান সময়। তিনি বলেন, “বৃষ্টি শুরু হওয়ার আগেই অনেক ক্রেতা অর্ডার দিয়ে রাখেন। কৃষক, জেলে এবং জলাবদ্ধ এলাকায় বসবাসকারী মানুষই আমাদের প্রধান ক্রেতা। বর্ষা যত ঘনিয়ে আসে, কাজের চাপও তত বাড়ে।”

কারিগরদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নৌকার আকার, কাঠের মান ও ব্যবহারভেদে দাম নির্ধারণ করা হয়। বর্তমানে ছোট নৌকা ৩ হাজার ৫০০ টাকা থেকে শুরু করে বড় নৌকা ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। উন্নতমানের দেশীয় কাঠ দিয়ে তৈরি হওয়ায় এসব নৌকা দীর্ঘদিন ব্যবহার করা যায়।

পূবাইলে তৈরি কাঠের নৌকার গুণগত মান ভালো হওয়ায় স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি জেলার বাইরেও এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। স্থানীয় জেলে, কৃষক ও ব্যবসায়ীরা নিয়মিত এসব নৌকা কিনে থাকেন। কারিগররা জানান, টেকসই কাঠ, মজবুত নির্মাণশৈলী এবং দীর্ঘস্থায়ী ব্যবহারের উপযোগিতার কারণে পূবাইলে তৈরি নৌকার সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে বিভিন্ন এলাকায়। ফলে বর্ষা এলেই স্থানীয় চাহিদার পাশাপাশি বাইরের অর্ডারও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায়।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বাজারে প্লাস্টিক ও টিনের তৈরি নৌকার প্রচলন বাড়লেও কাঠের নৌকার প্রতি মানুষের আস্থা এখনও অটুট। কৃষিকাজ, মাছ ধরা, পণ্য পরিবহন এবং জলাবদ্ধ এলাকায় যাতায়াতের জন্য কাঠের নৌকাকেই অধিক কার্যকর ও টেকসই মনে করেন তারা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পূবাইলের এই ঐতিহ্যবাহী নৌকা শিল্প বহু পরিবারের জীবিকার অন্যতম প্রধান উৎস। বর্ষা মৌসুমে নৌকা বিক্রির আয় দিয়েই অনেক কারিগর তাদের পরিবারের বার্ষিক ব্যয়ের বড় একটি অংশ নির্বাহ করেন। তবে কাঠের দাম বৃদ্ধি এবং উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় কারিগরদের নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

তবুও সময়ের পরিবর্তন ও প্রযুক্তির অগ্রগতির মধ্যেও পূবাইলের কাঠের নৌকা শিল্প হারিয়ে যায়নি। মানুষের প্রয়োজন, কারিগরদের দক্ষতা এবং গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে এর গভীর সম্পর্কের কারণেই শতবর্ষী এই ঐতিহ্য আজও টিকে আছে। বর্ষার আগমনে পূবাইলের নৌকা পল্লীতে এখন কর্মচাঞ্চল্য, ব্যস্ততা ও নতুন সম্ভাবনার গল্প রচিত হচ্ছে।