রবিবার, ১৯ জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৪ শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
৪ সফর, ১৪৪৮ হিজরি

হাসিনাকে দিয়ে এক ঢিলে বহু পাখির মারার অঙ্ক কষছে দিল্লি

মুক্তবাণী রিপোর্ট : প্রায় দু-বছর ধরে ভারতের মাটিতে থাকা হাসিনা নেতা-কর্মীদের নিয়ে ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফিরতে চান। দেশে ফিরে তিনি আদালতে আত্মসমর্পণ করার ইচ্ছাও প্রকাশ করেছেন। তার এই বক্তব্য সামনে আসার পর বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারতেও তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। তবে দিল্লির পর্যবেক্ষকরা একে ‘দেশে ফেরার সুনির্দিষ্ট ঘোষণা’ হিসেবে দেখার চেয়ে ‘জল মাপার চেষ্টা’ হিসেবেই বেশি দেখছেন।-সূত্র: বিবিসি বাংলা।

ভারতের আনুষ্ঠানিক অবস্থান:

শেখ হাসিনার ভারতে থাকা নিয়ে দিল্লির অবস্থান আনুষ্ঠানিকভাবে অপরিবর্তিত রয়েছে। গত কয়েকদিনে ভারতের পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ভারত শেখ হাসিনাকে নিজে থেকে ডেকে এনে আশ্রয়ও দেয়নি, আবার এখন জোর করে তাড়িয়েও দিচ্ছে না।

সাউথ ব্লকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মন্তব্য করেছেন, ‘পরিস্থিতি যাচাই করে তিনি যদি দেশে ফিরতে চান, ফিরবেন। আর যদি মনে করেন ভারতেই থাকবেন, তাহলে তাই।’

রয়টার্সকে দেওয়া সেই সাক্ষাৎকার:

গত সপ্তাহে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হাসিনা জানান, তিনি আগামী ডিসেম্বরে দলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে দেশে ফেরার পরিকল্পনা করছেন এবং আদালতে আত্মসমর্পণ করতে চান।

তিনি আরো বলেন, দেশে ফিরলে তাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে, এমনকি ফাঁসিও দেওয়া হতে পারে, এটা জেনেও তিনি ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

দিল্লির পর্যবেক্ষণ ও ‘এক ঢিলে অনেক পাখি’:

শেখ হাসিনার এই বক্তব্য নিয়ে দিল্লির শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তা, বিশ্লেষক ও সাবেক কূটনীতিক এবং ভারতে আশ্রিত আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কথা বলেছে বিবিসি। এই আলোচনা থেকে প্রধানত দুটি বিষয় উঠে এসেছে—

প্রথমত, শেখ হাসিনা এ কথা বলেছেন মানেই তিনি ডিসেম্বরেই ভারত থেকে ঢাকায় ফিরবেন—এমনটা নাও হতে পারে। মাঝের এই পাঁচ মাসে পরিস্থিতি কোন দিকে গড়ায়, বাংলাদেশ সরকার কী প্রতিক্রিয়া দেখায় এবং আন্তর্জাতিক বিশ্ব হাসিনাকে নিয়ে কী মনোভাব পোষণ করে—এই সব বিষয়ের ওপরই তার প্রত্যাবর্তন নির্ভর করবে।

দ্বিতীয়ত, হাসিনা এই সিদ্ধান্ত কোনো বিদেশি সরকারের সঙ্গে পরামর্শ করে না নিলেও, তিনি যে ভারতের প্রচ্ছন্ন সম্মতি ছাড়া এই বক্তব্য দেননি, সে বিষয়ে পর্যবেক্ষকরা একমত। ভারত সরকারও মনে করছে, এই ঘোষণায় তাদের ক্ষতি নেই, বরং লাভ বেশি। হাসিনা ফিরে গেলে ভারত দু-বছরের কূটনৈতিক অস্বস্তি থেকে মুক্তি পাবে। আর যদি না-ও ফেরেন, তাহলেও দিল্লি বলতে পারবে যে হাসিনা তো ফিরতেই চেয়েছিলেন, কিন্তু বাংলাদেশ সরকার অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারেনি। ফলে এই বক্তব্যকে ‘এক ঢিলে অনেকগুলো পাখি মারা’র শামিল বলে মনে করা হচ্ছে, যার মাধ্যমে বলটা বাংলাদেশ সরকারের কোর্টে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।

পর্দার আড়ালের দরকষাকষি ও দিল্লির অঙ্ক:

ঢাকায় ভারতের সাবেক হাই কমিশনার পিনাকরঞ্জন চক্রবর্তী মনে করেন, শেখ হাসিনা সত্যিই ফিরতে সিরিয়াস, কারণ আওয়ামী লীগকে বাঁচাতে তার ফেরা দরকার।

তিনি বলেন, হাসিনা ঢাকায় ফিরলে মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে আদালতে আপিল করবেন এবং বিচার চলাকালীন তাকে নিরাপদ হেফাজতে রাখা হতে পারে। সেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পর্দার আড়ালে দিল্লি ও ঢাকার মধ্যে দরকষাকষি হলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

দিল্লির রাজনৈতিক বিশ্লেষক জয়ন্ত রায়চৌধুরীর মতে, শেখ হাসিনা বিএনপির কাছে বার্তা দিতে চান যে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করে অপ্রাসঙ্গিক করার চেষ্টা তিনি নিজে গিয়ে রুখবেন।

নেতা-কর্মীদের মনোভাব:

২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ভারতে আশ্রয় নিয়ে থাকা কয়েক হাজার আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীর মধ্যে হাসিনার এই বক্তব্য নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেক নেতা মনে করেন, বর্তমান জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে হাসিনা ফিরে আসুক, তা বিএনপি সরকার চাইবে না।

হাসিনা দেশে ফিরলে কতজন তার সঙ্গী হবেন, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, তারা নেত্রীর সঙ্গে বিমানে করে ফিরতে প্রস্তুত।

তবে সাবেক এক ক্যাবিনেট সদস্য জানান, শেখ হাসিনার বিচারের দিকে আন্তর্জাতিক নজর থাকবে, কিন্তু সাধারণ নেতা-কর্মীরা দেশে ফিরলে তাৎক্ষণিক মিথ্যা মামলায় জেলে চলে যাবেন, যা কেউ জানতেও পারবে না। ফলে শেষ পর্যন্ত কতজন তার সঙ্গী হবেন, তা এখনই বলা মুশকিল।