নিজস্ব প্রতিবেদক : দেশে প্রতিদিন গড়ে ৪০ জন শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়। বছরে এ সংখ্যা ১৮ হাজারেরও বেশি।
অথচ এটি একটি সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য জনস্বাস্থ্য সমস্যা। এ পরিস্থিতিতে শিশুদের পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে সরকারি অর্থায়নের পাশাপাশি বেসরকারি খাত, স্থানীয় সরকার, উন্নয়ন সহযোগী এবং গণমাধ্যমকে সম্পৃক্ত করে টেকসই অর্থায়নের কাঠামো গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
রোববার রাজধানীর ডেইলি স্টার সেন্টারে ‘পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু প্রতিরোধ ও শিশু সুরক্ষায় টেকসই অর্থায়ন’ শীর্ষক অংশীজন সংলাপে তারা এ আহ্বান জানান।
গণমাধ্যম ও যোগাযোগবিষয়ক উন্নয়ন সংস্থা সমষ্টি মিডিয়া কমিউনিকেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের আয়োজনে এবং গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটরের সহযোগিতায় এ সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে সমষ্টির নির্বাহী পরিচালক মীর মাসরুরুজ্জামান বলেন, দেশে প্রতিদিন গড়ে ৪০ জন শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়, কিন্তু এই নীরব সংকট এখনো প্রয়োজনীয় গুরুত্ব পাচ্ছে না। অধিকাংশ দুর্ঘটনা ঘটে সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টার মধ্যে, যখন অভিভাবকেরা কর্মব্যস্ত থাকেন এবং শিশুদের পর্যাপ্ত তত্ত্বাবধান নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না।
তিনি বলেন, একটি শিশু শুধু বড় জলাশয়ে নয়, অল্প পানিতেও ডুবে মারা যেতে পারে। তাই ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে নিরাপদ তত্ত্বাবধান নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
সংলাপে সমষ্টির গবেষণা ও যোগাযোগ পরিচালক রেজাউল হক জানান, জাতীয় কর্মপরিকল্পনায় ২০৩০ সালের মধ্যে পানিতে ডুবে মৃত্যু ৫০ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমানে প্রতিবছর ১৮ হাজারের বেশি মানুষ পানিতে ডুবে মারা যায়। এ কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে অর্থের উৎস, বাজেট লাইন এবং ব্যয়-ট্র্যাকিং ব্যবস্থা আরও সুস্পষ্ট করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, সমাজভিত্তিক সমন্বিত শিশু যত্ন ও সাঁতার সুবিধা (আইসিবিসিসি) প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের ১৬টি জেলায় শিশুযত্ন কেন্দ্র, জীবনরক্ষাকারী সাঁতার প্রশিক্ষণ, সিপিআর, নিরাপদ উদ্ধার এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। প্রকল্পটির দ্বিতীয় পর্যায় বর্তমানে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. কাজী মারুফুল ইসলাম বলেন, ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধকে শুধু প্রকল্প হিসেবে নয়, একটি ধারাবাহিক সামাজিক সেবা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এজন্য স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে আরও কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করার প্রয়োজন রয়েছে।
অর্থ বিভাগের উপসচিব জামিরা শবনম বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাকে অগ্রাধিকার দিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার, স্থানীয় সরকার এবং অন্যান্য অংশীজনের সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
ঢাকা ট্রিবিউনের সম্পাদক রিয়াজ আহমদ চলমান প্রকল্পগুলো বন্ধ না করে প্রয়োজন অনুযায়ী সম্প্রসারণের আহ্বান জানান।
তিনি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাভিত্তিক পরিকল্পনা এবং তথ্যনির্ভর ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
নগদ’র হেড অব পাবলিক কমিউনিকেশন্স জাহিদুল ইসলাম সজল বলেন, করপোরেট খাতকে সম্পৃক্ত করতে হলে বিষয়টির সামাজিক গুরুত্ব এবং অংশগ্রহণের সুযোগ স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে।
তিনি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে জনসম্পৃক্ততা ও অর্থ সংগ্রহের সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করেন।
সাদাকালো’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক আজহারুল হক আজাদ, চর্চা ডটকম’র সম্পাদক সোহরাব হাসান, মানবজমিন’র বার্তা সম্পাদক কাজল ঘোষ, দৈনিক ইত্তেফাক’র স্টাফ রিপোর্টার রাবেয়া বেবী, প্রথম আলো’র সহকারী বার্তা সম্পাদক পার্থ শংকর সাহা, চ্যানেল আইয়ের স্টাফ রিপোর্টার জাহিদ রহমান এবং আগামী সময়ের সাইদুজ্জামান রওশনসহ গণমাধ্যম প্রতিনিধিরা ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে গণমাধ্যমের ভূমিকা, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করেন।
চর্চা ডটকম’র সম্পাদক সোহরাব হাসান বলেন, ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক উদ্যোগকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। তিনি স্থানীয় পর্যায়ে বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন।
সিনারগোস’র কমিউনিকেশন ম্যানেজার সাজিয়া আফরিন বলেন, আইসিবিসি প্রকল্পে কারিগরি সহযোগী হিসেবে কাজ করতে গিয়ে তারা দেখেছেন, কমিউনিটি পর্যায়ে এ উদ্যোগের ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। তিনি বলেন, এটি এমন একটি বিষয়, যেখানে শুধু প্রকল্প চলাকালীন নয়, প্রকল্প শেষ হওয়ার পরও কার্যক্রম কীভাবে চলমান রাখা যায়, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
আলোচনায় বক্তারা বলেন, সরকারি অর্থায়ন হবে মূল ভিত্তি। কার্যক্রমের স্থায়িত্ব ও সম্প্রসারণ নিশ্চিত করতে বেসরকারি খাত, করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর), উন্নয়ন সহযোগী এবং স্থানীয় উদ্যোগকে সম্পূরক অংশীদার হিসেবে যুক্ত করা প্রয়োজন। তারা ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে নিয়মিত অর্থায়নের কাঠামো, মন্ত্রণালয়ভিত্তিক বাজেট লাইন, স্থানীয় সরকারের সম্পৃক্ততা, বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ এবং স্বচ্ছ প্রতিবেদন ব্যবস্থার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।