সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৩০ ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২ রবিউস সানি, ১৪৪৮ হিজরি

সহজলভ্য ড্যান্ডির ছোবলে বিপন্ন পথশিশুদের ভবিষ্যৎ

মো. হাফিজ উদ্দিন :

দেশের পথশিশুদের বড় একটি অংশের শৈশব কাটছে মাদক, অনিশ্চয়তা আর নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের (ডিএনসি) এক গবেষণায় দেশজুড়ে ১ হাজার ৬০০ পথশিশুর সাক্ষাৎকার নিয়ে দেখা গেছে, তাদের ৯২৮ জনই কোনো না কোনো মাদক গ্রহণ করে। অর্থাৎ গবেষণায় অংশ নেওয়া পথশিশুদের ৫৮ শতাংশ মাদক ব্যবহার করত। শুধু মাদক গ্রহণ নয়, তাদের একটি অংশকে মাদক বহনের কাজেও ব্যবহার করা হচ্ছে। ৯২৮ মাদক গ্রহণকারী শিশুর মধ্যে ৩৩৬ জন মাদক বহনের সঙ্গে যুক্ত থাকার কথা জানিয়েছে।
পথশিশুদের জীবনযাপনের আরেকটি বড় গবেষণাও পরিস্থিতির গভীরতা সামনে এনেছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের ‘সার্ভে অন স্ট্রিট চিলড্রেন ২০২২’-এ দেশের আট বিভাগ ও ঢাকার বিভিন্ন হটস্পটে ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী ৭ হাজার ২০০ শিশুর কাছ থেকে তথ্য নেওয়া হয়। জরিপে অংশ নেওয়া শিশুদের ৩০ শতাংশের বেশি পাবলিক বা খোলা জায়গায় থাকে ও ঘুমায়। প্রায় অর্ধেক শিশু মাটির ওপর পাটের বস্তা, কার্টন, প্লাস্টিক কিংবা পাতলা কম্বল বিছিয়ে ঘুমায়। ৭১ দশমিক ৮ শতাংশ শিশু পড়তে বা লিখতে পারে না। আর ৭৯ শতাংশ শিশু জানেই না, পথশিশুদের জন্য কাজ করা সংগঠন বা প্রতিষ্ঠান থেকে কী ধরনের সহায়তা পাওয়া যায়।

২০২৪ সালে ইউনিসেফের করা আরেকটি গুণগত গবেষণায় দেশের বিভিন্ন জেলার ৪০০-এর বেশি পথশিশুর অভিজ্ঞতা নেওয়া হয়। সেখানে রাস্তায় থাকা শিশুদের জীবনে মাদক, অপরাধী চক্র, সহিংসতা, নিরাপত্তাহীনতা ও সেবা থেকে বঞ্চিত থাকার বিষয়গুলোও উঠে এসেছে। গবেষণাটি দেখিয়েছে, এসব শিশু দেশের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও সেবাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীগুলোর একটি।
গবেষণার এই পরিসংখ্যানের ভেতরেই লুকিয়ে আছে ড্যান্ডির ভয়াবহতার গল্প। এমন এক নেশা, যার উপকরণ অনেক ক্ষেত্রেই শিশুর হাতের নাগালেই পাওয়া যায়। ফলে প্রচলিত মাদকের মতো নির্দিষ্ট কোনো বিক্রয়কেন্দ্রের ওপর নির্ভর করতে হয় না। বৈধভাবে ব্যবহৃত আঠা বা সলিউশনের আড়ালেই নেশার উপকরণ পৌঁছে যেতে পারে একটি শিশুর হাতে।
পলিথিনের ছোট্ট একটি ব্যাগ। ভেতরে সামান্য আঠাজাতীয় সলিউশন। ব্যাগটি মুখের কাছে নিয়ে কয়েকবার শ্বাস টানতেই বদলে যায় শিশুটির আচরণ। কিছুক্ষণ আগেও ক্লান্ত শরীরে রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো শিশুটির চোখেমুখে তখন অন্যরকম ভাব। ক্ষুধা, ক্লান্তি কিংবা দিনের নানা কষ্ট থেকে যেন সাময়িকভাবে সে দূরে সরে গেছে।

পথশিশুদের মধ্যে পরিচিত এই নেশার নাম ‘ড্যান্ডি’। তবে ড্যান্ডি কোনো একটি নির্দিষ্ট মাদকদ্রব্যের নাম নয়। সাধারণত আঠাজাতীয় সলিউশনের বাষ্প শুঁকে নেশা করার প্রবণতাকেই এই নামে ডাকা হয়। এসব সলিউশনে টলুইনসহ বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রাবক থাকতে পারে। টলুইনের বাষ্প শ্বাসের সঙ্গে শরীরে গেলে নেশার অনুভূতি তৈরি হতে পারে। ফলে বৈধভাবে ব্যবহৃত আঠাজাতীয় পণ্যই পরিণত হচ্ছে কিছু শিশুর নেশার উপকরণে।
ড্যান্ডির ভয়াবহতা বাড়ছে এর সহজলভ্যতায়। জুতা, চামড়া, রাবারসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত আঠা ও সলিউশন বাজারে বৈধভাবেই বিক্রি হয়। ফলে প্রচলিত মাদকের মতো সব সময় নির্দিষ্ট কোনো মাদক বিক্রির জায়গায় যেতে হয় না। বৈধ পণ্যের আড়ালেই নেশার উপকরণ পৌঁছে যাচ্ছে পথশিশুদের হাতে।

সন্ধ্যা নামার আগেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরতে থাকে ১০ বছরের মুনায়েম হাসান। দিনের বড় একটা সময় কাটে এদিক-ওদিক ঘুরে। কাজের ফাঁকে কিংবা অবসরে তার সঙ্গী হয় আরও কয়েকজন শিশু। বয়স কারও ৮, কারও ১০, আবার কারও ১২ বছর। যে বয়সে স্কুলে যাওয়ার কথা, মাঠে খেলাধুলা করার কথা, সেই বয়সেই তাদের অনেকের দিন কাটে রাস্তায়।

মুনায়েম থাকে আগারগাঁও এলাকায়। দিনে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বেড়ালেও রাতে তার থাকার নির্দিষ্ট কোনো ঘর নেই। রাস্তার মাঝের রেলিংয়ের ভেতরই রাত কাটে তার। সেখানেই কোনোভাবে ঘুমিয়ে পড়ে। দিনের ব্যস্ত শহর যখন রাতে ধীরে ধীরে শান্ত হয়, তখন মুনায়েমের মতো শিশুদের কাছে ফুটপাত, রেলিং কিংবা রাস্তার পাশের জায়গাই হয়ে ওঠে আশ্রয়।

এই বাস্তবতার সঙ্গে ড্যান্ডি যুক্ত হলে সংকট আরও গভীর হয়। রাস্তায় থাকা, পরিবারের সঙ্গে বিচ্ছিন্নতা, ক্ষুধা, অল্প বয়সে কাজে নামা, শিক্ষা থেকে ছিটকে পড়া এবং নিরাপত্তাহীনতার সঙ্গে যুক্ত হয় মাদকের ব্যবহার। আর অন্য অনেক মাদকের তুলনায় ড্যান্ডির বড় সুবিধা- এটি হাতের নাগালেই পাওয়া যায়, দামও তুলনামূলক কম।

ডিএনসির গবেষণার তথ্য সেই ঝুঁকির মাত্রা বোঝায়। গবেষণায় অংশ নেওয়া ১ হাজার ৬০০ পথশিশুর মধ্যে ৯২৮ জন মাদক গ্রহণের কথা জানিয়েছে। তাদের ৩৩৬ জন আবার মাদক বহনের সঙ্গেও যুক্ত। অর্থাৎ পথশিশুদের একটি অংশ একদিকে মাদকের ভোক্তা, অন্যদিকে মাদক সরবরাহ ব্যবস্থারও বাহক হয়ে উঠছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় তাদের বয়স। আপনার দেওয়া ডিএনসি গবেষণার তথ্যে দেখা যায়, ১৪ শতাংশ শিশু জানিয়েছে, তারা ১০ বছর বয়স হওয়ার আগেই মাদক গ্রহণ শুরু করেছে। অর্থাৎ অনেক শিশুর জীবনে মাদকের প্রবেশ কৈশোরে পৌঁছানোর আগেই ঘটছে। ঢাকার পথশিশুদের মধ্যে ড্যান্ডি ব্যবহারের প্রবণতাও বেশি বলে ওই গবেষণায় উঠে এসেছে। বিশেষ করে ৫ থেকে ১০ বছর বয়সী পথশিশুদের মধ্যে ড্যান্ডি গ্রহণের প্রবণতা বেশি।
একটি শিশুর মাদকের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার বয়স যখন ১০ বছরের নিচে নেমে আসে, তখন সেটিকে শুধু মাদকাসক্তির সমস্যা হিসেবে দেখলে পুরো চিত্র ধরা পড়ে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে পরিবার, বাসস্থান, শিক্ষা, খাদ্য, নিরাপত্তা এবং সামাজিক অবস্থান। একটি শিশু কেন স্কুলে নেই, কেন রাতে ঘরে ফেরে না, কেন তাকে সারাদিন রাস্তায় থাকতে হচ্ছে- এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গেলেই মাদকের পেছনের বড় সংকটগুলো সামনে আসে।

বিবিএস ও ইউনিসেফের জরিপে দেশের পথশিশুদের জীবনযাপনের সেই সংকটেরই চিত্র পাওয়া যায়। জরিপে অংশ নেওয়া শিশুদের ৮২ শতাংশ ছেলে। এসব শিশুর বড় একটি অংশ দারিদ্র্য ও কাজের সন্ধানে রাস্তায় আসে। প্রায় ১৩ শতাংশ শিশু পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন। আরও প্রায় ৬ শতাংশ শিশু এতিম অথবা তাদের বাবা-মা বেঁচে আছেন কি না, সেটিও তারা জানে না। অর্থাৎ অনেক শিশুর জীবনে পরিবারের নিরাপদ আশ্রয়ই নেই।

থাকার জায়গার চিত্রও ভয়াবহ। জরিপে অংশ নেওয়া ৩০ শতাংশের বেশি শিশু পাবলিক বা খোলা জায়গায় থাকে ও ঘুমায়। তাদের জন্য ঘুমানোর নিরাপদ ঘর নেই, দরজা বন্ধ করে নিরাপদে থাকার সুযোগ নেই। প্রায় অর্ধেক শিশু মাটির ওপর পাটের বস্তা, কার্টন, প্লাস্টিক কিংবা পাতলা কম্বল বিছিয়ে ঘুমায়। এমনকি জরিপে শিশুদের ঘুমের সময়ও সহিংসতার শিকার হওয়ার তথ্য উঠে এসেছে।

এমন পরিবেশে বেড়ে ওঠা শিশুর কাছে মাদক কতটা সহজে পৌঁছাতে পারে, সেটিও ভাবার বিষয়। যে শিশুর রাত কাটে ফুটপাতে, দিনের বড় অংশ কাটে স্টেশন কিংবা বাজারে, তার চারপাশে কারা ঘোরাফেরা করে তা নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ তার নেই। সে কার সঙ্গে মিশছে, কে তাকে কী দিচ্ছে, কে তাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে- এসব দেখার মতো কোনো অভিভাবকও অনেক ক্ষেত্রে পাশে থাকে না।

ড্যান্ডির ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি। কারণ এটি এমন কোনো মাদক নয়, যার জন্য সব সময় নির্দিষ্ট মাদক বিক্রির জায়গায় যেতে হয়। আঠা বা সলিউশনজাতীয় কিছু পদার্থে থাকা রাসায়নিকের বাষ্প শুঁকে নেশা করা হয়। এসব উপাদানের কিছু বৈধ ব্যবহার থাকায় মাদক হিসেবে এর প্রবাহ শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ করা অন্য অনেক মাদকের তুলনায় কঠিন। ফলে সহজে পাওয়া যায় এমন কিছু পণ্যের আড়ালেও এর ব্যবহার চলতে পারে।
মাদকের এই সহজ প্রবেশপথের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে শিশুদের অসহায়ত্ব। একটি শিশু যখন রাস্তায় থাকে, তার ওপর পরিবারের নিয়ন্ত্রণ থাকে না। শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে। নিয়মিত খাবারের নিশ্চয়তা থাকে না। একই সঙ্গে থাকে নানা ধরনের মানুষের সংস্পর্শ। ফলে মাদক কারবারিরা চাইলে তাদের সহজেই ব্যবহার করতে পারে।
বিবিএসের জরিপে পথশিশুদের শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্নতার চিত্রও স্পষ্ট। অংশ নেওয়া শিশুদের ৭১ দশমিক ৮ শতাংশ পড়তে বা লিখতে পারে না। অর্থাৎ প্রতি চারজনের মধ্যে প্রায় তিনজনই মৌলিক পড়াশোনার বাইরে। এই শিক্ষাবঞ্চনা তাদের ভবিষ্যৎ জীবিকার সুযোগও সীমিত করে দেয়।
জীবিকার জন্য অল্প বয়সেই কাজে নামতে হয় তাদের। কেউ বর্জ্য সংগ্রহ করে, কেউ ভিক্ষা করে, কেউ চায়ের দোকানে কাজ করে। কেউ আবার কারখানা কিংবা ওয়ার্কশপে শ্রম দেয়। জরিপে অংশ নেওয়া কর্মজীবী শিশুদের প্রায় অর্ধেক নয় বছর বয়সেই কাজ শুরু করেছে। অধিকাংশ শিশু সপ্তাহে ৩০ থেকে ৪০ ঘণ্টা কাজ করে এবং সপ্তাহে এক হাজার টাকার কম আয় করে।
অর্থাৎ সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর তাদের সামনে স্কুল নয়, কাজ আসে। বিকেলে খেলার মাঠ নয়, আসে জীবিকার চিন্তা। রাতে পরিবারের নিরাপদ ঘর নয়, জায়গা হয় ফুটপাত কিংবা স্টেশনের কোনো কোণ। এই জীবনযাপনের সঙ্গে যখন মাদকের সহজলভ্যতা যুক্ত হয়, তখন একটি শিশুর ঝুঁকি কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
কর্মক্ষেত্রেও নিরাপদ নয় তাদের জীবন। জরিপে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ শিশু কাজের সময় আহত হওয়ার কথা জানিয়েছে। প্রায় অর্ধেক শিশু কর্মক্ষেত্রে সহিংসতার শিকার হয়েছে। রাস্তায় থাকার কারণে তাদের প্রতিনিয়ত নানা ধরনের হয়রানি ও নির্যাতনের মুখেও পড়তে হয়।
২০২৪ সালে ইউনিসেফের করা গুণগত গবেষণাতেও পথশিশুদের জীবনে মাদক ও অপরাধের ঝুঁকির বিষয়টি উঠে এসেছে। দেশের বিভিন্ন জেলার ৪০০-এর বেশি শিশুর অভিজ্ঞতা নেওয়া হয় ওই গবেষণায়। ঢাকার কমলাপুর, সদরঘাট, বিমানবন্দর, মিরপুর এবং গাবতলী-আমিনবাজার-ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে থাকা শিশুদের অভিজ্ঞতাও এতে অন্তর্ভুক্ত ছিল। গবেষণাটি দেখিয়েছে, রাস্তায় থাকা শিশুদের সুরক্ষা ও সামাজিক সেবার ঘাটতি তাদের নানা ধরনের ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আসে- পথশিশুরা শুধু মাদকের শিকার নয়, অনেক সময় মাদককেন্দ্রিক অপরাধেরও অংশ হয়ে উঠতে পারে। ডিএনসির গবেষণায় মাদক বহনের সঙ্গে ৩৩৬ শিশুর যুক্ত থাকার তথ্য সেটিই দেখায়। প্রথমে হয়তো সামান্য অর্থের বিনিময়ে কোনো একটি প্যাকেট পৌঁছে দেওয়ার কাজ। পরে সেটিই ধীরে ধীরে বড় ধরনের অপরাধী নেটওয়ার্কের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে পারে।
মাদকের এই চক্র থেকে শিশুদের বের করে আনা তাই শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়। এটি একই সঙ্গে শিশু অধিকার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা এবং পুনর্বাসনের বিষয়। কিন্তু পথশিশুদের জন্য থাকা সেবাগুলো কতটা তাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে?
বিবিএস ও ইউনিসেফের জরিপে ৭৯ শতাংশ শিশু জানিয়েছে, পথশিশুদের জন্য কাজ করা সংগঠন বা প্রতিষ্ঠান থেকে কী ধরনের সহায়তা পাওয়া যায়, সে বিষয়ে তারা জানে না। অর্থাৎ যাদের সবচেয়ে বেশি সহায়তা প্রয়োজন, তাদের বড় একটি অংশ জানেই না কোথায় গেলে সেই সহায়তা পাওয়া যাবে।
এখানেই সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের বড় একটি ঘাটতি দেখা যায়। একটি শিশুকে রাস্তা থেকে সরিয়ে কয়েক দিনের জন্য আশ্রয় দিলেই সমস্যার সমাধান হয় না। তাকে শিক্ষা দিতে হবে, স্বাস্থ্যসেবা দিতে হবে, খাবারের নিশ্চয়তা দিতে হবে। মাদকাসক্ত হলে চিকিৎসা ও কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। পরিবার থাকলে পরিবারের কাছে নিরাপদে ফেরানোর ব্যবস্থা করতে হবে। পরিবার না থাকলে দীর্ঘমেয়াদি বিকল্প আশ্রয় নিশ্চিত করতে হবে।
শুধু অভিযান চালিয়ে ড্যান্ডির ব্যবহার বন্ধ করা সম্ভব নয়। কারণ ড্যান্ডি ব্যবহারকারী শিশুটিকে যদি রাস্তা থেকে সরিয়ে আবার একই পরিবেশে ছেড়ে দেওয়া হয়, তাহলে সে আবারও সেই নেশার জগতে ফিরে যেতে পারে। তাই মাদকবিরোধী অভিযানকে শিশু পুনর্বাসনের সঙ্গে যুক্ত করা জরুরি।
মাদক সরবরাহের উৎস বন্ধ করার পাশাপাশি কোথা থেকে শিশুরা এসব উপকরণ পাচ্ছে, কারা তাদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে এবং কারা শিশুদের মাদক বহনে ব্যবহার করছে- সেসব বিষয়েও নজর দিতে হবে। একই সঙ্গে পথশিশুদের নিয়মিত অবস্থান করা জায়গাগুলোতে সামাজিক সেবা ও নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।
স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন পথশিশু কল্যাণ ফাউন্ডেশনের পরিচালক নাজমুল হাসান রাসেল ঢাকা মেইলকে বলেন, পথশিশুদের মাদক থেকে পুরোপুরি দূরে রাখতে হলে সরকার, সিটি করপোরেশন, সামাজিক সংগঠন ও সমাজের সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, পথশিশুদের জন্য বিশেষায়িত সরকারি পুনর্বাসন ও মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র স্থাপনের পাশাপাশি শিশুদের দিয়ে যারা মাদক ব্যবসা করায়, সেই মূল হোতাদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। সিটি করপোরেশনের পার্ক, বাস টার্মিনাল, স্টেশন ও ফুটপাতে নজরদারি বাড়িয়ে এসব স্থান শিশুদের জন্য নিরাপদ করতে হবে। একই সঙ্গে ওয়ার্ডভিত্তিক আশ্রয়কেন্দ্র, মৌলিক শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।
নাজমুল হাসান রাসেল বলেন, পথশিশুদের প্রতি ঘৃণা বা অবহেলা না দেখিয়ে সমাজকে সহানুভূতির সঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে। তাদের খাবার, পোশাক ও বিনোদনের মতো মৌলিক চাহিদা পূরণেও সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি ও সামাজিক সংগঠনগুলোর ভূমিকা রাখতে হবে। তবে শুধু সাময়িক আশ্রয় বা খাবার দিয়ে এই সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়। পথশিশুদের কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত করে আত্মনির্ভরশীল করে তোলাই তাদের মাদক থেকে চিরতরে দূরে রাখা এবং সমাজের মূলধারায় ফিরিয়ে আনার সবচেয়ে স্থায়ী ও কার্যকর উপায়।
বাংলাদেশ শিশু কল্যাণ ট্রাস্টের সহকারী পরিচালক (শিক্ষা ও কারিগরি) মো. মাহবুবুর রাব্বানী বলেন, ‘আমরা মূলত স্কুল থেকে ঝরে পড়া শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার আওতায় আনার বিষয়টি নিয়ে কাজ করি। তাদের শিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে বিদ্যালয়ে ফেরানোর চেষ্টা করা হয়। তবে পথশিশুদের জন্য বাংলাদেশ শিশু কল্যাণ ট্রাস্টের আলাদা কোনো কার্যক্রম বর্তমানে নেই।’
গবেষণার পরিসংখ্যান থেকে মুনায়েমের মতো একটি শিশুর জীবনের বাস্তবতায় ফিরে তাকালে সমস্যাটির গভীরতা আরও স্পষ্ট হয়। যে বয়সে তার হাতে থাকার কথা বই-খাতা, সেই বয়সে তার আশ্রয় রেলিংয়ের ভেতর। যে বয়সে ক্ষুধা মেটানোর দায়িত্ব থাকার কথা পরিবারের, সে বয়সে জীবিকার চিন্তা তাকে রাস্তায় টেনে আনে। আর সেই রাস্তাতেই যদি নেশার উপকরণ সহজে পাওয়া যায়, তাহলে একটি শিশুর ভবিষ্যৎ বিপন্ন হতে খুব বেশি সময় লাগে না।