মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২৪ ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২৫ রবিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি

শাহজালালে স্বর্ণ চোরাচালান : নিরাপত্তার ফাঁক বন্ধ হোক

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দেশের প্রধান প্রবেশদ্বার। প্রতিদিন দেশি-বিদেশি বিপুলসংখ্যক যাত্রী, পণ্য ও উড়োজাহাজের চলাচলের মধ্য দিয়ে এই বিমানবন্দর দেশের অর্থনীতি ও যোগাযোগব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অথচ সেই বিমানবন্দর ঘিরেই যদি দীর্ঘদিন ধরে স্বর্ণ চোরাচালানের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক সক্রিয় থাকে, তাহলে তা শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, রাজস্বব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহির জন্যও গুরুতর সতর্কবার্তা।

সর্বশেষ দুবাই-চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটের বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইট থেকে ১২০টি স্বর্ণের বার উদ্ধারের ঘটনা সেই উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। আটক বিমানকর্মীর পরা বেল্টের ভেতর থেকে প্রায় ১৩ দশমিক ৯২ কেজি সোনা উদ্ধারের ঘটনা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ওই কর্মী গত ছয় মাসে অন্তত পাঁচটি চালান বিমানের ভেতর থেকে বাইরে নিয়ে যাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। অভিযোগের সত্যতা তদন্তে প্রমাণিত হওয়া জরুরি; তবে ঘটনাটি একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছে- বিমানবন্দরের এত স্তরের নিরাপত্তা পেরিয়ে এত বিপুল মূল্যের সোনা কীভাবে বারবার বাইরে চলে যাচ্ছে?

বিষয়টি আরও উদ্বেগজনক কারণ এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে মনে হচ্ছে না। বিভিন্ন সময়ে উড়োজাহাজের কার্গো কম্পার্টমেন্ট, টয়লেটের প্যানেলসহ বিমানের অভ্যন্তরীণ অংশ থেকে বিপুল পরিমাণ সোনা উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে। বিমানকর্মীদের কেউ কেউ এতে জড়িত থাকার অভিযোগেও তদন্তের আওতায় এসেছেন। বিমানবন্দর থানার পরিসংখ্যানও সমস্যাটির ব্যাপ্তি স্পষ্ট করে। ২০২১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে স্বর্ণ চোরাচালানের ঘটনায় ৫৫০টি মামলা হয়েছে এবং আসামি করা হয়েছে ৪৯০ জনকে। একই সময়ে প্রায় ২ হাজার কেজি সোনা জব্দ হয়েছে, যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা।

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- শুধু জব্দের সংখ্যা দিয়ে সাফল্য পরিমাপ করা যাবে না। বিপুল পরিমাণ সোনা ধরা পড়ছে মানে বিপুল পরিমাণ সোনা কোনো না কোনোভাবে দেশের সীমান্তব্যবস্থা অতিক্রমের চেষ্টা করছে। একটি চালান আটক হওয়া যেমন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাফল্য, তেমনি একই ধরনের চালান বারবার বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ভেদ করতে পারা ব্যবস্থার দুর্বলতারও প্রমাণ।

বিশেষ করে বিমানকর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার। বিমানবন্দরের নিরাপত্তা কেবল স্ক্যানার, তল্লাশি বা সিসিটিভির ওপর নির্ভর করলে চলবে না। যাদের বিমানের কার্গো, টেকনিক্যাল অংশ, কেবিন, পরিচ্ছন্নতা কিংবা গ্রাউন্ড অপারেশনের নির্দিষ্ট এলাকায় প্রবেশাধিকার রয়েছে, তাদের জন্য পৃথক ও কঠোর নিরাপত্তা কাঠামো প্রয়োজন। কর্মীদের পরিচয়পত্র ব্যবহার, ডিউটি পরিবর্তন, অতিরিক্ত সময় কাজ, সংবেদনশীল এলাকায় প্রবেশ এবং বিমান থেকে বের হওয়ার সময় তাদের গতিবিধি প্রযুক্তিনির্ভরভাবে পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। একই সঙ্গে চোরাচালানের মূল হোতাদের ধরতে হবে। দেশে একজন বাহক বা সহযোগীকে গ্রেপ্তার করলেই নেটওয়ার্ক ভাঙবে না। বিদেশে অবস্থানকারী কথিত নিয়ন্ত্রক, দেশে থাকা সংগ্রাহক, অর্থের জোগানদাতা, বাহক এবং বিমানবন্দরের ভেতরের সহযোগীদের মধ্যে আর্থিক ও যোগাযোগের যোগসূত্র খুঁজে বের করতে হবে। এ ক্ষেত্রে কাস্টমস, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা, বাংলাদেশ বিমান এবং আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে তথ্য বিনিময় আরও কার্যকর করা দরকার। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জব্দ করা সোনার ব্যবস্থাপনা। প্রায় তিন হাজার কেজি সোনা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে পড়ে থাকার তথ্যও উদ্বেগজনক। বিচারাধীন মামলার আলামত সংরক্ষণ অবশ্যই জরুরি; কিন্তু মামলার নিষ্পত্তি বছরের পর বছর ঝুলে থাকলে রাষ্ট্রের সম্পদ নিষ্ক্রিয় অবস্থায় পড়ে থাকে। যেসব ক্ষেত্রে আইনগতভাবে নিলামের সুযোগ রয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে স্বচ্ছ ও দ্রুত নিলাম প্রক্রিয়া চালু করা দরকার। এতে রাষ্ট্র রাজস্ব পাবে এবং জব্দ করা সম্পদও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ফিরে আসবে।

স্বর্ণ চোরাচালান বন্ধে তাই বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়, প্রয়োজন সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা। বিমানবন্দরের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় প্রবেশাধিকার পুনর্মূল্যায়ন, কর্মীদের নিয়মিত নিরাপত্তা যাচাই, সম্পদের সঙ্গে কর্মীদের জীবনযাত্রার অসামঞ্জস্য শনাক্তে আর্থিক নজরদারি, উন্নত স্ক্যানিং ও ট্র্যাকিং প্রযুক্তির ব্যবহার এবং অভিযোগ তদন্তে দ্রুততার সঙ্গে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

সবচেয়ে বড় কথা, বিমানবন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোনো ‘ভেতরের সহযোগী’ থাকার সুযোগ রাখা যাবে না। কারণ বাইরে থেকে আসা চোরাকারবারির চেয়ে ভেতরের সহায়তাকারী অনেক বেশি বিপজ্জনক। শাহজালাল বিমানবন্দরকে চোরাচালানিদের নিরাপদ করিডর নয়, বরং কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এজন্য দায়িত্বে অবহেলা যেমন শাস্তিযোগ্য হতে হবে, তেমনি নির্দোষ কর্মীদের হয়রানি না করে প্রমাণভিত্তিক তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ও সুনাম রক্ষায় এখনই এই ফাঁকগুলো বন্ধ করা জরুরি।