বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২৫ ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২৬ রবিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি

কিউআর কোড বসবে অটোতে : অটোরিকশায় শৃঙ্খলা ফেরাতে চাই সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা

দেশের পরিবহনব্যবস্থার অনিবার্য বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। শহর ও গ্রামের লাখ লাখ মানুষ স্বল্প ও মাঝারি দূরত্বে যাতায়াতের জন্য এই বাহনের ওপর নির্ভরশীল। অটোরিকশাকে কেন্দ্র করে বড় একটি কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র প্রসারিত হয়েছে। তবে এর নিবন্ধন, লাইসেন্স, রুট ও নিরাপত্তাবিধির প্রয়োজন অনুভূত হচ্ছে অনেক দিন ধরেই। অটোরিকশার লাইসেন্স ও রুট নির্ধারণ করে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

জাতীয় সংসদে অনুমোদিত অটোরিকশায় নম্বরপ্লেট ও কিউআর কোড সংযোজনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এটা সময়োপযোগী উদ্যোগ। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, মানুষের বাস্তব প্রয়োজনেই অটোরিকশার বিস্তার ঘটেছে। প্রচলিত গণপরিবহনের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অটোরিকশায় ভাড়া কম। অলিগলিতে চলতে পারে অনায়াসে। এতে চেপে যাত্রীরা সরাসরি গন্তব্যে পৌঁছে যাচ্ছেন। কিছু সুবিধা পাচ্ছেন বলেই যাত্রীরা অটোরিকশায় চড়ছেন।

চালক, মালিক, গ্যারেজকর্মী, মেরামতকর্মী, যন্ত্রাংশ ব্যবসায়ী ও চার্জিংকেন্দ্রের কর্মীদের জীবিকাও অটোরিকশার ওপর নির্ভরশীল। যে কারণে অটোরিকশার বিষয়ে নীতিনির্ধারণের সময় শুধু যানজট বা সড়ক নিরাপত্তাকে বিবেচনা করলে চলছে না। এর ওপর নির্ভরশীল যাত্রী সাধারণের যাতায়াত ও কর্মজীবীদের জীবিকার বিষয়টিও ভাবতে হচ্ছে সরকারকে। আবার অনিয়ন্ত্রিত অটোরিকশার কারণে যেসব সমস্যা দেখা দিচ্ছে সেগুলোকেও উপেক্ষা করা যায় না। এখন এর নিবন্ধনের বাধ্যবাধকতা নেই। হু হু করে এর সংখ্যা বাড়ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, দেশে ৫০ থেকে ৮০ লাখের মতো ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল করছে। এর মধ্যে ঢাকাতেই রয়েছে ৪৮ হাজারের বেশি অটোরিকশা।

অনেক অটোরিকশায় কাঠামোগত ত্রুটি রয়েছে। এর চালকদের নেই কোনো প্রশিক্ষণ। লাইসেন্সের বালাই নেই। সমস্যা হচ্ছে, অলিগলি থেকে অটোরিকশা উঠে এসেছে প্রধান সড়কে। কখনো কখনো জাতীয় সড়কেও এর দেখা মেলে। পথচারীদের সড়ক পারাপারের সুযোগটিও দেয় না। ফলে সড়কের শৃঙ্খলা বিঘ্নিত হচ্ছে, দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ক্যামেরার মাধ্যমে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন শনাক্ত করা গেলেও নম্বরপ্লেট না থাকায় অটোরিকশার বিরুদ্ধে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না। এসব কারণে প্রতিটি অটোরিকশাকে সুশৃঙ্খল ব্যবস্থার আওতায় আনা জরুরি।

এ ক্ষেত্রে নম্বরপ্লেট ও কিউআর কোড চালু করা গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ হতে পারে। প্রতিটি অটোরিকশা, এর মালিক-চালক ও অনুমোদিত রুটের তথ্য একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ব্যবস্থায় সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। একটি নিবন্ধন নম্বর দিয়ে যাতে একাধিক যানবাহন চালানো না যায়, সে ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে। চালকদের প্রশিক্ষণ ও পরীক্ষার মাধ্যমে লাইসেন্স দিতে হবে।

প্রধান সড়কে অটোরিকশা চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে নির্দিষ্ট রুটে চালানোর পরিকল্পনাটিও বাস্তবসম্মত। তবে এ ক্ষেত্রে বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখা জরুরি। কোনো এলাকার সব অটোরিকশা একসঙ্গে উচ্ছেদ করে দিলে যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়তে পারে। কর্মহীন হতে পারেন বহু মানুষ। বরং কোন সড়কে অটোরিকশা চলবে, কোথায় চলবে না— সেটা নির্ধারণ করে দেওয়াই যুক্তিযুক্ত। সেগুলো নির্ধারিত রুট মেনে চলছে কি না সেটা নিয়মিত মনিটর করতে হবে। কোন এলাকায় কত সংখ্যক অটোরিকশা প্রয়োজন, সেটা বাস্তবসম্মতভাবে নির্ধারণ করতে হবে।

অটোরিকশাকে বড় গণপরিবহনের বিকল্প হিসেবে নয়, বরং অভ্যন্তরীণ সড়ক থেকে প্রধান গণপরিবহনের সঙ্গে সংযোগকারী বাহন হিসেবে পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে প্রধান সড়কের ওপর চাপ কমবে, যাত্রীরাও সুবিধা পাবেন।

অবৈধ চার্জিং ব্যবস্থা বন্ধ করাও জরুরি। অবৈধ সংযোগ দেওয়ার সঙ্গে বিদ্যুৎ বিভাগের বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কেউ জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি পর্যাপ্তসংখ্যক বৈধ চার্জিংকেন্দ্র তৈরি করতে হবে। তা হলে অবৈধ ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করার প্রয়োজন পড়বে না।

অটোরিকশা নিয়ে করা পরিকল্পনাগুলো ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়ন করা জরুরি। দেশে বহু ক্ষেত্রে পরিকল্পনা হয়েছে, কিন্তু বাস্তবায়ন হয়নি। অটোরিকশাকে সুশৃঙ্খল ব্যবস্থার অধীনে আনতে হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। অবৈধ যান ও চার্জিংকেন্দ্রের বিরুদ্ধে যেমন ব্যবস্থা নিতে হবে, তেমন বৈধ হওয়ার বাস্তব সুযোগও দিতে হবে। হঠাৎ উচ্ছেদ নয়, অটোরিকশাকে ধাপে ধাপে শৃঙ্খলায় আনাই হতে পারে কার্যকর সমাধান।