সামাজিক অস্থিরতা ও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার শিথিলতা বর্তমানে জাতিকে এমন এক বিভীষিকাময় বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে, যেখানে মানুষের জীবনের নিরাপত্তা একেবারেই ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে। পত্রিকার পাতায় স্থান পেয়েছে দেশব্যাপী একাধিক অপরাধের ঘটনা, যা এক কথায় লোমহর্ষক ও হৃদয়বিদারক। আইফোনের লোভে কিংবা সামান্য ক্ষোভ থেকে কিশোরকে হত্যা, এক প্লেট ভাত খাওয়াকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর ওপর চরম নির্যাতন ও তাকে ভবন থেকে ফেলে দেওয়ার মতো অবিশ্বাস্য নির্মমতা কেবল অপরাধের সংখ্যা বৃদ্ধির নির্দেশক নয়; বরং এগুলো আমাদের সমাজের গভীর মনস্তাত্ত্বিক বিচ্যুতির নগ্ন প্রকাশ। এর সঙ্গে যখন যোগ হয় পারিবারিক কলহের জেরে জন্মদাতা পিতার হাতে অবোধ শিশুদের বিষপানের মতো ভয়াবহ পরিণতি কিংবা দাম্পত্য বিরোধের জেরে একই পরিবারের একাধিক মানুষের লাশ উদ্ধারের ঘটনা, তখন স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, মানুষের মনস্তত্ত্ব ও স্বাভাবিক জীবনবোধ আজ নিদারুণ সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে।
বলা বাহুল্য, আইনের শাসনের দুর্বলতা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে অপরাধীদের মনে শাস্তির ভয় দিন দিন বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। যৌতুকের দাবিতে নারীর ওপর অব্যাহত নির্যাতন, তার প্রতিবাদ করতে গিয়ে আত্মীয়স্বজনের ওপর হাতুড়িপেটার মতো সন্ত্রাসী হামলা অথবা পথ থেকে অপহরণের পর সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়ে তরুণীর করুণ মৃত্যু প্রমাণ করে-অপরাধীরা কতটা বেপরোয়া মানসিকতার হয়ে উঠেছে। এই নৈরাজ্যময় পরিস্থিতি সাধারণ মানুষের চিন্তা ও মনস্তাত্ত্বিক গঠনে এক বিপজ্জনক পরিবর্তন আনছে। দীর্ঘদিন ধরে ন্যায়বিচার না পাওয়া, অপরাধীর পার পেয়ে যাওয়া এবং সামাজিক নিরাপত্তার অভাব প্রত্যক্ষ করতে করতে সাধারণ মানুষের মন থেকে স্বাভাবিক সামাজিক সহমর্মিতা, ধৈর্য ও নৈতিক দায়বদ্ধতা মুছে যাচ্ছে। ফলস্বরূপ, তুচ্ছ কারণে চরম সহিংস হয়ে ওঠা বা সামান্য স্বার্থ ও প্রলোভনে নৃশংসতম অপরাধে জড়িয়ে পড়ার মতো প্রবণতা সমাজে দ্রুত ডালপালা মেলছে, যা পুরো মানবীয় চেতনাকে বিপর্যস্ত করে তুলছে।
আমরা মনে করি, এই ভয়াবহ অবক্ষয় ও সামাজিক বিপর্যয় থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে প্রথমেই আইনি কাঠামোর কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা অপরিহার্য। যে কোনো অপরাধ ঘটামাত্রই কালক্ষেপণ না করে দ্রুততম সময়ে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে অপরাধীদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে, যাতে বিচারের দৃশ্যমান ও কঠোর প্রয়োগ দেখে অপরাধপ্রবণ মানসিকতা থমকে যেতে বাধ্য হয়। তবে শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রচলিত তৎপরতাই এই গভীর সামাজিক ক্ষত শতভাগ নিরাময় করতে পারবে না। অপরাধ দূরীকরণে সরকার, সমাজ ও সচেতন নাগরিকদের সমন্বিত উদ্যোগই অতীব জরুরি হয়ে পড়েছে।
বিশেষ করে কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে স্থানীয় পর্যায়ে প্রশাসনিক নজরদারি বৃদ্ধির পাশাপাশি মাদক সিন্ডিকেট ও কিশোর গ্যাংসহ অপরাধীদের মূলোৎপাটনে বিশেষ অভিযান চালাতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার ও গণমাধ্যমের যৌথ উদ্যোগে সমাজের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ, নৈতিক শিক্ষা ও পরমতসহিষ্ণুতার চর্চা জোরদার করা আবশ্যক। সামাজিকভাবে আইনের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা এবং মানুষের জীবনের প্রতি মৌল সম্মান পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা না গেলে এই চরম মানসিক দেউলিয়াত্ব ও সামাজিক অরাজকতা থেকে কোনোভাবেই মুক্তি পাওয়া সম্ভব হবে না।