☰

শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১০ আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
১৩ রবিউস সানি, ১৪৪৮ হিজরি

জাতিসংঘের মঞ্চে বিশ্ব নেতাদের যত অদ্ভুত কাণ্ড

মুক্তবাণী ডেস্ক : জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন শুরু হয়েছে। বিশ্ব রাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মঞ্চ হলো জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ।

প্রতি বছর নিউইয়র্কের জাতিসংঘ সদর দপ্তরে বিশ্বের প্রায় সব দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানরা একত্রিত হন মানবতার বড় সংকটগুলোর সমাধান খুঁজতে। যুদ্ধ, শান্তি, জলবায়ু পরিবর্তন, দারিদ্র্য, উন্নয়ন ও মানবাধিকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয় এই মঞ্চে।

তবে গম্ভীর কূটনীতির এই মঞ্চে শুধু নীতিগত বক্তব্যই নয়, ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে বেশ কিছু অদ্ভুত, নাটকীয় ও কখনও হাস্যকর ঘটনাও।

কখনও নেতার দীর্ঘ ভাষণ, কখনও রাগের বহিঃপ্রকাশ, কখনও শিশুর উপস্থিতি, আবার কখনও ডাইনোসরের ‘বক্তৃতা’-সব মিলিয়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ইতিহাসে রয়েছে নানা স্মরণীয় মুহূর্ত।

১. খ্রুশ্চেভের জুতা কাণ্ড
জাতিসংঘের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনার একটি ১৯৬০ সালের ‘জুতা কাণ্ড’।

১২ অক্টোবর ১৯৬০ সালে ফিলিপাইনের প্রতিনিধি বক্তব্য দেওয়ার সময় সোভিয়েত নেতা নিকিতা খ্রুশ্চেভ ক্ষুব্ধ হয়ে টেবিলে জুতার আঘাত করেছিলেন বলে বহু প্রত্যক্ষদর্শী দাবি করেন।
তবে এ ঘটনার ভিডিও ফুটেজ পাওয়া যায়নি এবং জাতিসংঘের আনুষ্ঠানিক কার্যবিবরণীতেও এর উল্লেখ নেই। পরবর্তী সময়ে নিজের স্মৃতিকথায় খ্রুশ্চেভ এ ঘটনার দায় স্বীকার করেন।

.২. ফিদেল কাস্ত্রোর সাড়ে চার ঘণ্টার ভাষণ
১৯৬০ সালে কিউবার নেতা ফিদেল কাস্ত্রো জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে প্রায় ৪ ঘণ্টা ২৯ মিনিট বক্তব্য দেন। নির্ধারিত সময়ের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি দীর্ঘ এই ভাষণ এখনো সাধারণ পরিষদে’র দীর্ঘতম ভাষণ হিসেবে স্মরণ করা হয়।
কাস্ত্রো ভাষণে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও কিউবার অবস্থান নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেন। তার দীর্ঘ বক্তৃতা কূটনৈতিক মহলে যেমন আলোচনার জন্ম দেয়, তেমনি গণমাধ্যমেও ব্যাপক সাড়া ফেলে।

৩. গাদ্দাফির অদ্ভুত ভাষণ
২০০৯ সালে লিবিয়ার নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফি জাতিসংঘে প্রথমবারের মতো বক্তব্য দেন। প্রায় ৯০ মিনিটের ভাষণে তিনি নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ক্ষমতা নিয়ে সমালোচনা করেন এবং বিভিন্ন ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ও বিতর্কিত মন্তব্য করেন। এমনকি জাতিসংঘ সনদ নিয়েও তিনি নাটকীয় আচরণ করেন।
তার বক্তব্য এতটাই ব্যতিক্রমী ছিল যে, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এটি দীর্ঘদিন আলোচিত হয়।

৪. হুগো চাভেজের ‘শয়তানের গন্ধ’
২০০৬ সালে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হুগো চাভেজ যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের বক্তব্যের পর জাতিসংঘের মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘এখানে এখনো সালফারের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে’-যা মূলত বুশকে ‘শয়তান’ হিসেবে ইঙ্গিত করে করা মন্তব্য ছিল। ঘটনাটি বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করে।

.৫. নেতানিয়াহুর কার্টুন বোমা প্রদর্শন
২০১২ সালে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বোঝাতে একটি হাতে আঁকা কার্টুন বোমার ছবি দেখান। তিনি একটি লাল রেখা দিয়ে দেখান, কোন পর্যায়ে গেলে পারমাণবিক সক্ষমতা উদ্বেগজনক হতে পারে। ঘটনাটি অনেকের কাছে অস্বাভাবিক উপস্থাপনা হিসেবে আলোচিত হয়।

৬. গ্রেটা থুনবার্গের আবেগঘন বক্তব্য
২০১৯ সালে জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলনে ১৬ বছর বয়সী সুইডিশ পরিবেশকর্মী গ্রেটা থুনবার্গের বক্তব্য বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলে। বিশ্ব নেতাদের উদ্দেশে তার ‘হাউ ডেয়ার ইউ’ মন্তব্য জলবায়ু আন্দোলনের অন্যতম প্রতীকী মুহূর্ত হয়ে ওঠে।

৭. জাতিসংঘে ডাইনোসরের ‘বক্তৃতা’
জাতিসংঘের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী প্রচারণামূলক ঘটনাগুলোর একটি ২০২১ সালের।
২৭ অক্টোবর জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি ‘ফ্র্যাঙ্কি’ নামের একটি ডাইনোসরকে দিয়ে একটি ভিডিও তৈরি করে। সেখানে ডাইনোসরের কণ্ঠে জীবাশ্ম জ্বালানিতে বিনিয়োগ বন্ধের আহ্বান জানানো হয়।
ফ্র্যাঙ্কি জাতিসংঘের মঞ্চে দাঁড়িয়ে বিশ্ব নেতাদের উদ্দেশে বলে-মানুষ যেন এমন কিছু না করে যা শেষ পর্যন্ত নিজের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।

বাস্তবে ডাইনোসরটি ছিল কম্পিউটার প্রযুক্তিতে তৈরি একটি চরিত্র, তবে ভিডিওটি বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

৮. বক্তৃতার সময় প্রতিনিধিদের বের হয়ে যাওয়া
জাতিসংঘের মঞ্চে কখনও কখনও বক্তৃতার সময় কূটনৈতিক প্রতিবাদও দেখা যায়। কোনো দেশের বক্তব্যে আপত্তি জানিয়ে প্রতিনিধিরা সভাকক্ষ ত্যাগ করেছেন-যা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে একটি দৃশ্যমান বার্তা হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

৯. টেলিপ্রম্পটার বন্ধ, নেতার তাৎক্ষণিক বক্তৃতা
জাতিসংঘের অধিবেশনে প্রযুক্তিগত সমস্যাও মাঝে মাঝে আলোচনার বিষয় হয়। ২০২৫ সালের অধিবেশনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্যের সময় টেলিপ্রম্পটার সমস্যার ঘটনা নিয়ে আলোচনা হয়; তিনি বিষয়টি নিয়ে রসিকতাও করেন বলে গণমাধ্যমে আসে।

১০. গ্যাভেল নিয়ে কূটনৈতিক ইতিহাস
১৯৫২ সালে আইসল্যান্ড জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতিকে একটি বিশেষ হাতুড়ি উপহার দেয়। অধিবেশন শুরু ও শেষ করা, এজেন্ডা অনুমোদন এবং ভোটের সময় এই গ্যাভেল ব্যবহার করা হয়।

১৯৬০ সালে সোভিয়েত নেতা নিকিতা খ্রুশ্চেভের উত্তেজনাপূর্ণ আচরণ থামাতে গিয়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি আইরিশ কূটনীতিক ফ্রেডেরিক বোল্যান্ড ভুলবশত সেই গ্যাভেল ভেঙে ফেলেন। পরে আইসল্যান্ড থেকে এর একটি প্রতিরূপ তৈরি করা হয়। ২০০৫ সালে সেটিও হারিয়ে গেলে আবার নতুন একটি তৈরি করা হয়।

১২. জাতিসংঘ ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়া একমাত্র দেশ
জাতিসংঘের ইতিহাসে একমাত্র দেশ হিসেবে ইন্দোনেশিয়া ১৯৬৫ সালে সংস্থা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল।
মালয়েশিয়ার সঙ্গে বিরোধের জেরে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সুকর্নোর নেতৃত্বে ইন্দোনেশিয়া এই সিদ্ধান্ত নেয়। তবে এক বছর পর নেতৃত্ব পরিবর্তনের পর দেশটি আবার জাতিসংঘের সঙ্গে পূর্ণ সহযোগিতায় ফিরে আসে।

.১৩. জাতিসংঘ ভবনে হলিউড সিনেমা
জাতিসংঘ সদর দপ্তর সাধারণত চলচ্চিত্রের শুটিংয়ের জন্য উন্মুক্ত ছিল না। তবে ২০০৫ সালে হলিউড সিনেমা ‘দ্যা ইন্টারপ্রেটার’ র কিছু দৃশ্য জাতিসংঘ ভবনের ভেতরে ধারণ করা হয়।

সিডনি পোলাক পরিচালিত এই সিনেমার গল্পের সঙ্গে জাতিসংঘের পরিবেশ গুরুত্বপূর্ণভাবে যুক্ত থাকায় কর্তৃপক্ষ শুটিংয়ের অনুমতি দেয়।

১৪. জাতিসংঘে তিন মাসের শিশুর উপস্থিতি
২০১৮ সালে নিউজিল্যান্ডের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরডার্ন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে নিজের তিন মাস বয়সী শিশুকন্যা নেভে তে আরোহাকে নিয়ে উপস্থিত হন।
শিশুটির জন্য ছিল বিশেষ পরিচয়পত্র-‘ নিউজিল্যান্ড ফার্স্ট বেবি’ ব্যাজ। জাতিসংঘের ইতিহাসে এত কম বয়সী কোনো শিশুর উপস্থিতি আগে দেখা যায়নি।

এই ঘটনা বিশ্বজুড়ে রাজনীতিতে নারী ও মায়েদের অংশগ্রহণ নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি করে। আরডার্ন জানান, শিশুকে সঙ্গে আনার অন্যতম কারণ ছিল তিনি তাকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছিলেন। পরে ভাষণ দেওয়ার সময় শিশুটির দায়িত্ব নেন তার স্বামী।

১৫. করোনায় ভার্চুয়াল জাতিসংঘ অধিবেশন
২০২০ সালে করোনা মহামারির কারণে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্ব নেতাদের বার্ষিক উচ্চপর্যায়ের অধিবেশন ভার্চুয়াল মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হয়।

কোভিড-১৯, জলবায়ু পরিবর্তন, লিঙ্গ সমতা ও বৈশ্বিক সহযোগিতা ছিল সেই অধিবেশনের প্রধান আলোচ্য বিষয়।

বিশ্ব নেতারা নিউইয়র্কে সশরীরে উপস্থিত না হয়ে ভিডিও বার্তার মাধ্যমে বক্তব্য দেন।

উল্লেখ্য, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বিশ্ব নেতারা সাধারণত নিজেদের দেশের অবস্থান তুলে ধরেন। তবে দীর্ঘ ইতিহাসে এই মঞ্চে আবেগ, রাগ, নাটকীয় অঙ্গভঙ্গি, অপ্রত্যাশিত মন্তব্য এবং কখনও হাস্যকর পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছে। এসব ঘটনা দেখিয়েছে-বিশ্ব কূটনীতি শুধু নথি ও চুক্তির বিষয় নয়, এটি মানুষের আচরণ ও ব্যক্তিত্বেরও প্রতিফলন।