স্বপন রবি দাশ, হবিগঞ্জ : হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার ফয়জাবাদ বধ্যভূমির বিভিন্ন স্থাপনা ও স্মৃতিচিহ্ন রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বধ্যভূমির কিছু অংশে ঝোপ-ঝাড় গজিয়েছে। টিলায় ওঠার সিঁড়ি ও রেলিংয়ের কয়েকটি অংশ নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। সন্ধ্যার পর পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা না থাকায় এলাকাটি অন্ধকার থাকে। স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা রাতে সেখানে মাদকসেবীদের আড্ডা বসার অভিযোগ করেছেন।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, বাহুবল উপজেলার আমতলী চা-বাগানের ৪ নম্বর সেকশনের একটি টিলায় ফয়জাবাদ বধ্যভূমি অবস্থিত। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে মিরপুর বাজার থেকে কিছুটা দূরে বধ্যভূমিতে ওঠার জন্য একটি সিঁড়ি রয়েছে। সিঁড়িটির কয়েকটি স্থানে রেলিং নেই। কিছু রেলিং নড়বড়ে অবস্থায় রয়েছে। বধ্যভূমির স্থাপনার কয়েকটি অংশ ও টাইলসও ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় দেখা যায়। চারপাশের কিছু জায়গায় ঝোপ-ঝাড় রয়েছে।
বধ্যভূমিতে পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা না থাকায় সন্ধ্যার পর পুরো এলাকায় স্বাভাবিক চলাচল ও নজরদারি কঠিন হয়ে পড়ে। তবে রাতে সেখানে মাদকসেবীদের নিয়মিত আড্ডা বসার অভিযোগের বিষয়ে কোনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় বাসিন্দা কাওছার মিয়া ও হেলাল বলেন, রাতে মাঝেমধ্যে বধ্যভূমি এলাকায় লোকজনের আনাগোনা দেখা যায়। তাঁদের দাবি, সেখানে মাদকসেবীদের আড্ডাও বসে। এ কারণে বধ্যভূমিতে নিয়মিত নজরদারি ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধের সময় বাহুবল ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষজনকে ধরে এনে এই এলাকায় হত্যার ঘটনা ঘটে। পরে বধ্যভূমিটি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০০৬ সালে সেখানে সিঁড়ি ও স্মৃতিচিহ্ন নির্মাণ করা হয়। তৎকালীন অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান বধ্যভূমিটির উদ্বোধন করেন।
এরপর বিভিন্ন জাতীয় দিবসে বধ্যভূমিতে কর্মসূচি পালন করা হয়ে থাকে। শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসসহ বিভিন্ন সময়ে সেখানে শ্রদ্ধা নিবেদন ও প্রদীপ প্রজ্বালনের আয়োজন করা হয়। তবে বছরের অন্য সময় নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তাব্যবস্থা সীমিত থাকায় স্থাপনাটি ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানান।
স্থানীয়দের ভাষ্য, আমতলী চা-বাগান কর্তৃপক্ষ মাঝেমধ্যে বধ্যভূমির আশপাশের ঝোপ-ঝাড় পরিষ্কার করে। তবে স্থাপনাটির নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য স্থায়ী কোনো কর্মী বা নিরাপত্তাব্যবস্থা নেই।
বাহুবল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) উজ্জ্বল রায় বলেন, বধ্যভূমিটির রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নির্দিষ্ট কোনো বরাদ্দ বা নিয়মিত নিরাপত্তাব্যবস্থা নেই। রাতে সেখানে মাদকসেবীদের উপস্থিতির কারণে স্থাপনার কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও তিনি জানান।
ইউএনও বলেন, ‘আগের স্যারেরা মেরামতের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু মেরামত করলেও আবার মাদকসেবীসহ অন্যরা সেগুলো নষ্ট করে বা খুলে নিয়ে যায়।’
তিনি বলেন, ‘এ ধরনের বধ্যভূমিতে নিয়মিত পাহারার জন্য নাইট গার্ডের ব্যবস্থা নেই। তবে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে চিঠির মাধ্যমে জানানো যায়। বধ্যভূমিটি কীভাবে সংরক্ষণ ও নিরাপদ রাখা যায়, সে বিষয়টি আমরা দেখব।’
স্থানীয় বাসিন্দারা বধ্যভূমিটির স্থাপনা সংস্কার, নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা এবং নিরাপত্তার ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থানটি সংরক্ষণ করা হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এর ইতিহাস তুলে ধরাও সহজ হবে।