দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ফাঁদ অভিযান দীর্ঘ বিরতির পর আবার সক্রিয় হওয়া নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি দপ্তরে ঘুষ গ্রহণের সময় কর্মকর্তাদের হাতেনাতে আটক করার এই পদ্ধতি দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি করে।
সম্প্রতি চট্টগ্রামের পাহাড়তলী সাবরেজিস্ট্রি কার্যালয়ে দুই লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণের সময় সাবরেজিস্ট্রারসহ তিনজনকে আটকের ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিয়েছে, সরকারি সেবার বিভিন্ন স্তরে ঘুষের অভিযোগ কতটা গুরুতর। তবে কয়েকটি অভিযান পরিচালনা করলেই দুর্নীতির বিস্তার রোধ হবে- এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। প্রয়োজন ধারাবাহিক অভিযান, কার্যকর তদন্ত এবং দৃষ্টান্তমূলক আইনি পরিণতি। ঘুষ এমন একটি অনিয়ম, যার সরাসরি শিকার সাধারণ মানুষ। একটি সনদ, নিবন্ধন, অনুমোদন, বিল কিংবা সরকারি সেবা পেতে যদি নাগরিককে নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয়, তাহলে রাষ্ট্রের সেবাব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, অনেক ক্ষেত্রে ঘুষকে যেন একটি অনানুষ্ঠানিক নিয়মে পরিণত করা হয়েছে। ফলে ভুক্তভোগীরা হয়রানি এড়াতে অভিযোগ না করে অর্থ দিতে বাধ্য হন। এই সংস্কৃতি ভাঙতে অভিযোগ গ্রহণ থেকে শুরু করে তদন্ত ও বিচার পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াকে সহজ, নিরাপদ ও কার্যকর করা জরুরি।
দুদকের হটলাইন ১০৬-এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পাহাড়তলীর সাম্প্রতিক অভিযানে অভিযোগকারী প্রথমে হটলাইনে যোগাযোগ করেছেন এবং পরবর্তী সময়ে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অর্থাৎ নাগরিকের অভিযোগের ভিত্তিতে যাচাই করে পরিকল্পিতভাবে অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব। তবে হটলাইনে অভিযোগ নেওয়ার পর অভিযোগকারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও অত্যন্ত জরুরি। অভিযোগ করার কারণে কোনো নাগরিক যেন পরবর্তী সময়ে হয়রানি, প্রতিশোধ বা প্রশাসনিক জটিলতার শিকার না হন, সে বিষয়ে কার্যকর সুরক্ষা থাকা দরকার।
ফাঁদ অভিযান দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান বার্তা দিতে পারে। কিন্তু এটিকে দুর্নীতি দমনের একমাত্র কৌশল হিসেবে দেখলে চলবে না। সরকারি দপ্তরের সেবাপ্রক্রিয়া যত বেশি জটিল ও অস্বচ্ছ থাকবে, ঘুষের সুযোগ তত বেশি থাকবে। তাই যেখানে সম্ভব সেবা অনলাইনে নেওয়া, আবেদন ও অনুমোদনের ধাপ কমানো, নির্ধারিত ফি ও সময়সীমা প্রকাশ করা এবং প্রতিটি পর্যায়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তাদের সম্পদ ও আয়-ব্যয়ের অসঙ্গতি শনাক্তে নিয়মিত নজরদারি বাড়াতে হবে। দুদকের অতীত পরিসংখ্যানেও দেখা যায়, একসময় ফাঁদ মামলা তুলনামূলক বেশি হলেও পরবর্তী সময়ে তা কমেছে। দীর্ঘ বিরতির পর নতুন করে এ ধরনের অভিযান জোরদার করার উদ্যোগ তাই ধারাবাহিকতা পাওয়ার দাবি রাখে। অভিযান শুরু করে মাঝপথে থেমে গেলে দুর্নীতিবাজদের মধ্যে কোনো স্থায়ী বার্তা যাবে না। বরং নিয়মিত, তথ্যভিত্তিক ও নিরপেক্ষ অভিযান চালাতে হবে। তবে হাতেনাতে আটকই শেষ কথা নয়। প্রতিটি মামলার তদন্ত দ্রুত ও পেশাদারভাবে সম্পন্ন করতে হবে। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে আইনের বিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। আবার অভিযোগ প্রমাণিত না হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অধিকারও রক্ষা করতে হবে। দুদকের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও প্রমাণনির্ভরতা তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দুর্নীতি কেবল অর্থের অপচয় ঘটায় না; এটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও নাগরিকের মধ্যকার আস্থার সম্পর্ক দুর্বল করে। তাই ঘুষের বিরুদ্ধে অভিযানকে বিচ্ছিন্ন কিছু গ্রেপ্তারের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে একটি দীর্ঘমেয়াদি দুর্নীতিবিরোধী ব্যবস্থার অংশ করতে হবে। ফাঁদ অভিযান চলুক, এনফোর্সমেন্ট কার্যক্রম বাড়ুক, পাশাপাশি সরকারি সেবাব্যবস্থার সংস্কারও এগিয়ে যাক। অভিযোগ করার সাহস যেন মানুষ পায় এবং অভিযোগের পর কার্যকর ব্যবস্থা যেন দৃশ্যমান হয়- এটাই হওয়া উচিত দুদকের অগ্রাধিকার। দীর্ঘদিন পর সক্রিয় হওয়া ফাঁদ অভিযান সেই ধারাবাহিকতার সূচনা করতে পারলে দুর্নীতিবিরোধী লড়াই আরও কার্যকর হবে।